ঢাকা ০২:৪২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৯ জুলাই ২০২৪, ৪ শ্রাবণ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

৯ মাসের মেয়ে মাঝে সহ নানি ও দাদি একসাথে প্রাণ গেল

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ১২:০৮:৫০ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৩ জুন ২০২৪ ৩৫ বার পড়া হয়েছে

সোহেল খানের নিজের বাড়ি আর শ্বশুরবাড়ি—দুই জায়গাতেই কান্নার রোল। এক দুর্ঘটনায় মা, স্ত্রী আর শাশুড়িকে হারিয়ে সোহেল পাগলপ্রায়। সোহেলের আপন বলতে এখন আছে কেবল ৯ মাসের মেয়ে। সোহেল বলেন, ‘আমার ৯ মাসের সন্তান রেখে আমার মা, স্ত্রী ও শাশুড়ি চলে গেল। আমার ৯ মাসের অবুঝ শিশুর কী হবে? ও মা ডাকার আগেই আল্লাহ ওর মাকে নিয়ে গেল।’

মা, স্ত্রী আর শাশুড়িকে হারিয়ে সোহেল পাগলপ্রায়

সোহেল খানকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন তাঁর চাচাতো ভাই মো. দুলাল খান। তাঁর চোখেও জল। তিনি বলেন, ‘সোহেলের মা মারা গেছে। আবার স্ত্রী ও শাশুড়ি মারা গেছে। এত শোক সইতে পারা কষ্টের! একবার মায়ের লাশের কাছে, আরেকবার স্ত্রী-শাশুড়ির লাশের কাছে দৌড়াদৌড়ি করছে সোহেল। ৯ মাসের মেয়েটার মা, নানি ও দাদি—সবাই চলে গেল। বাবা ছাড়া শিশুটিকে বড় করার কেউ রইল না।

গতকাল শনিবার বরগুনার আমতলীতে বিয়েবাড়িতে যাওয়ার পথে সেতু ভেঙে সাতজন মারা গেছেন। তাঁরা সবাই মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার ভদ্রাসন গ্রামের বাসিন্দা। রোববার সকালে জানাজা শেষে তাঁদের পারিবারিক কবরস্থানে দাফন সম্পন্ন হয়। এর আগে রাত তিনটার দিকে লাশ বাড়িতে পৌঁছালে স্বজনেরা কান্নায় ভেঙে পড়েন।

দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তিরা হলেন ভদ্রাসন গ্রামের আবুল কালাম আজাদের স্ত্রী শাহানাজ আক্তার (৪০) এবং তাঁর দুই মেয়ে তাহিদা (৭) ও তাসদিয়া (১১); একই এলাকার সোহেল খানের মা ফরিদা বেগম (৫৫), স্ত্রী রাইতি আক্তার (৩০), শাশুড়ি রুমি বেগম (৫০), এবং বাবুল মাদবরের স্ত্রী ফাতেমা বেগম (৪০)।

স্ত্রী ও দুই শিশুসন্তান হারিয়ে পাগলপ্রায় বাবা আবুল কালাম আজাদ। কোনো সান্ত্বনাতেই তাঁর আহাজারি থামছে না। বারবার তিনি বলে উঠছেন, ‘হায় আল্লাহ, আমার এ কী হলো! আমাকে তুমি নিয়ে যাও। আমি কাদের জন্য বাঁচব, বেঁচে থাকার সবটুকু সম্বল কেড়ে নিলে আল্লাহ। আমার সবকিছু শেষ হয়ে গেল।

আবুল কালামের প্রতিবেশী মো. মাসুম হোসেন বলেন, দুর্ঘটনায় নিহত সাতজনই একে অপরের স্বজন। বিয়ের দাওয়াত খেয়ে আজ রোববার আনন্দে বাড়ি ফেরার কথা ছিল তাঁদের। অথচ শোকের চাদরে ঢাকা পড়ে লাশ হয়ে ফিরলেন তাঁরা। এই মর্মান্তিক মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না এলাকাবাসী। সারা এলাকাজুড়ে বিষাদের ছায়া নেমে এসেছে।

পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, গত শুক্রবার দুপুরে আমতলীর কাউনিয়ার মনিরুল ইসলামের মেয়ে হুমায়রার সঙ্গে একই এলাকার সেলিম ইসলামের ছেলে সোহাগের বিয়ে হয়। শনিবার বউভাতের অনুষ্ঠানে যাওয়ার পথে বরগুনার আমতলী এলাকার হলদিয়া খালের ওপর লোহার ব্রিজ ভেঙে তাঁদের বহনকারী মাইক্রোবাস পানিতে পড়ে যায়। পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস পরে নারী-শিশুসহ ৯ জনের লাশ উদ্ধার করে।

দুর্ঘটনায় আহত ফজলুর রহমান খানের ছেলে সাবেক সেনাসদস্য মাহবুব খান সবুজের স্ত্রী দিশা জানান, ‘সেতু ভেঙে মাইক্রোবাস খালে পড়ে যাওয়ার পর আমরা জানালার কাচ ভেঙে বের হয়ে আসি। সেতু যখন ভেঙে পড়ে, তখন বলা হলেও ড্রাইভার দরজার লক খুলে দেয়নি। ড্রাইভার নিজে বের হয়ে যায় কিন্তু দরজার লক খোলেনি। মাইক্রোবাসের দরজা খোলা থাকলে আমরা সবাই বেঁচে যেতাম।

শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, খুবই মর্মান্তিক ঘটনা। তাঁরা খোঁজখবর নিচ্ছেন। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানাজায় শরিক হয়ে তাঁদের প্রত্যেকের দাফন খরচ বাবদ ১০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে।

এক দুর্ঘটনায় সোহেল খানের জীবন এক মুহূর্তে পাল্টে গেছে। তাঁর মা, স্ত্রী এবং শাশুড়ি সবাই একসঙ্গে মারা গেছেন, যা তাঁকে পাগলপ্রায় অবস্থায় ফেলেছে। এই শোকের ভার তিনি কীভাবে সামলাবেন, তা তিনি নিজেই জানেন না। সোহেলের পাশে আছেন তাঁর ৯ মাসের মেয়ে, যার ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি গভীর উদ্বিগ্ন। তাঁর চাচাতো ভাই মো. দুলাল খান সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন, কিন্তু সোহেলের চোখের জল থামছে না।

এ ঘটনায় তাঁদের পরিবারের সবাই এবং আশেপাশের মানুষ গভীর শোকে আচ্ছন্ন। এই মর্মান্তিক ঘটনা সবার মনকে ব্যথিত করেছে। সোহেল খান কেবল নিজের নয়, বরং পুরো পরিবারের শোক ও কষ্টের ভার বহন করছেন।

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

আপলোডকারীর তথ্য

৯ মাসের মেয়ে মাঝে সহ নানি ও দাদি একসাথে প্রাণ গেল

আপডেট সময় : ১২:০৮:৫০ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৩ জুন ২০২৪

সোহেল খানের নিজের বাড়ি আর শ্বশুরবাড়ি—দুই জায়গাতেই কান্নার রোল। এক দুর্ঘটনায় মা, স্ত্রী আর শাশুড়িকে হারিয়ে সোহেল পাগলপ্রায়। সোহেলের আপন বলতে এখন আছে কেবল ৯ মাসের মেয়ে। সোহেল বলেন, ‘আমার ৯ মাসের সন্তান রেখে আমার মা, স্ত্রী ও শাশুড়ি চলে গেল। আমার ৯ মাসের অবুঝ শিশুর কী হবে? ও মা ডাকার আগেই আল্লাহ ওর মাকে নিয়ে গেল।’

মা, স্ত্রী আর শাশুড়িকে হারিয়ে সোহেল পাগলপ্রায়

সোহেল খানকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন তাঁর চাচাতো ভাই মো. দুলাল খান। তাঁর চোখেও জল। তিনি বলেন, ‘সোহেলের মা মারা গেছে। আবার স্ত্রী ও শাশুড়ি মারা গেছে। এত শোক সইতে পারা কষ্টের! একবার মায়ের লাশের কাছে, আরেকবার স্ত্রী-শাশুড়ির লাশের কাছে দৌড়াদৌড়ি করছে সোহেল। ৯ মাসের মেয়েটার মা, নানি ও দাদি—সবাই চলে গেল। বাবা ছাড়া শিশুটিকে বড় করার কেউ রইল না।

গতকাল শনিবার বরগুনার আমতলীতে বিয়েবাড়িতে যাওয়ার পথে সেতু ভেঙে সাতজন মারা গেছেন। তাঁরা সবাই মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার ভদ্রাসন গ্রামের বাসিন্দা। রোববার সকালে জানাজা শেষে তাঁদের পারিবারিক কবরস্থানে দাফন সম্পন্ন হয়। এর আগে রাত তিনটার দিকে লাশ বাড়িতে পৌঁছালে স্বজনেরা কান্নায় ভেঙে পড়েন।

দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তিরা হলেন ভদ্রাসন গ্রামের আবুল কালাম আজাদের স্ত্রী শাহানাজ আক্তার (৪০) এবং তাঁর দুই মেয়ে তাহিদা (৭) ও তাসদিয়া (১১); একই এলাকার সোহেল খানের মা ফরিদা বেগম (৫৫), স্ত্রী রাইতি আক্তার (৩০), শাশুড়ি রুমি বেগম (৫০), এবং বাবুল মাদবরের স্ত্রী ফাতেমা বেগম (৪০)।

স্ত্রী ও দুই শিশুসন্তান হারিয়ে পাগলপ্রায় বাবা আবুল কালাম আজাদ। কোনো সান্ত্বনাতেই তাঁর আহাজারি থামছে না। বারবার তিনি বলে উঠছেন, ‘হায় আল্লাহ, আমার এ কী হলো! আমাকে তুমি নিয়ে যাও। আমি কাদের জন্য বাঁচব, বেঁচে থাকার সবটুকু সম্বল কেড়ে নিলে আল্লাহ। আমার সবকিছু শেষ হয়ে গেল।

আবুল কালামের প্রতিবেশী মো. মাসুম হোসেন বলেন, দুর্ঘটনায় নিহত সাতজনই একে অপরের স্বজন। বিয়ের দাওয়াত খেয়ে আজ রোববার আনন্দে বাড়ি ফেরার কথা ছিল তাঁদের। অথচ শোকের চাদরে ঢাকা পড়ে লাশ হয়ে ফিরলেন তাঁরা। এই মর্মান্তিক মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না এলাকাবাসী। সারা এলাকাজুড়ে বিষাদের ছায়া নেমে এসেছে।

পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, গত শুক্রবার দুপুরে আমতলীর কাউনিয়ার মনিরুল ইসলামের মেয়ে হুমায়রার সঙ্গে একই এলাকার সেলিম ইসলামের ছেলে সোহাগের বিয়ে হয়। শনিবার বউভাতের অনুষ্ঠানে যাওয়ার পথে বরগুনার আমতলী এলাকার হলদিয়া খালের ওপর লোহার ব্রিজ ভেঙে তাঁদের বহনকারী মাইক্রোবাস পানিতে পড়ে যায়। পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস পরে নারী-শিশুসহ ৯ জনের লাশ উদ্ধার করে।

দুর্ঘটনায় আহত ফজলুর রহমান খানের ছেলে সাবেক সেনাসদস্য মাহবুব খান সবুজের স্ত্রী দিশা জানান, ‘সেতু ভেঙে মাইক্রোবাস খালে পড়ে যাওয়ার পর আমরা জানালার কাচ ভেঙে বের হয়ে আসি। সেতু যখন ভেঙে পড়ে, তখন বলা হলেও ড্রাইভার দরজার লক খুলে দেয়নি। ড্রাইভার নিজে বের হয়ে যায় কিন্তু দরজার লক খোলেনি। মাইক্রোবাসের দরজা খোলা থাকলে আমরা সবাই বেঁচে যেতাম।

শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, খুবই মর্মান্তিক ঘটনা। তাঁরা খোঁজখবর নিচ্ছেন। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানাজায় শরিক হয়ে তাঁদের প্রত্যেকের দাফন খরচ বাবদ ১০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে।

এক দুর্ঘটনায় সোহেল খানের জীবন এক মুহূর্তে পাল্টে গেছে। তাঁর মা, স্ত্রী এবং শাশুড়ি সবাই একসঙ্গে মারা গেছেন, যা তাঁকে পাগলপ্রায় অবস্থায় ফেলেছে। এই শোকের ভার তিনি কীভাবে সামলাবেন, তা তিনি নিজেই জানেন না। সোহেলের পাশে আছেন তাঁর ৯ মাসের মেয়ে, যার ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি গভীর উদ্বিগ্ন। তাঁর চাচাতো ভাই মো. দুলাল খান সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন, কিন্তু সোহেলের চোখের জল থামছে না।

এ ঘটনায় তাঁদের পরিবারের সবাই এবং আশেপাশের মানুষ গভীর শোকে আচ্ছন্ন। এই মর্মান্তিক ঘটনা সবার মনকে ব্যথিত করেছে। সোহেল খান কেবল নিজের নয়, বরং পুরো পরিবারের শোক ও কষ্টের ভার বহন করছেন।