ঢাকা ০২:০৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৬ জুলাই ২০২৪, ১০ শ্রাবণ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

জোট সরকার চালানোর অভিজ্ঞতার অভাব মোদির

আবারো জোটের ওপর ভর করতে হচ্ছে মোদিকে

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৪:৪০:৩৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৫ জুন ২০২৪ ২৭ বার পড়া হয়েছে

আবারো জোটের ওপর ভর করতে হচ্ছে মোদিকে

2014 সালে, মোদির সরকার 282টি আসন পায়। পাঁচ বছর পরে, তারা 303 আসন লাভ করে। জোট সরকার চালানোর অভিজ্ঞতার অভাব মোদির। এখন, প্রথমবারের মতো, তিনি একটি গঠন করতে বাধ্য হয়েছেন। তিনি টানা তৃতীয় মেয়াদে আবারও প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথে। তিনি জওহরলাল নেহরুর পদাঙ্ক অনুসরণ করেন, যিনি এই ধরনের কৃতিত্বের কথা চিন্তা করেছিলেন। যদিও নেহেরু একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে ব্যর্থ হন, মোদির লক্ষ্য “চার শূন্য” অর্থবহ করে রাজীব গান্ধীর রেকর্ড ছাড়িয়ে যাওয়া।

গতকাল, লোকসভা নির্বাচনে এককভাবে বিজেপি সর্বোচ্চ সংখ্যক আসন লাভ করলেও, এনডিএ-র কাছে তিনশো আসনের ঘাটতি রয়েছে। কংগ্রেস “ভারত” জোটের সূচনা করেছিল, মোদির বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকারের অবসান ঘটাতে এক দশক পর দৃঢ়ভাবে উঠেছিল। সরকার গঠনের সময়, মোদি এখন প্রাথমিকভাবে বিরোধিতা করছেন। তার প্রতিটি পদক্ষেপ বিরোধী জোট ভারত থেকে প্রতিরোধের মুখোমুখি হবে।

ভারতের নির্বাচন কমিশন এবং মিডিয়া রিপোর্ট অনুসারে, বিজেপির এনডিএ 286টি আসন পেয়েছে। ভারতীয় জোট 202টি আসন পেয়েছে। বিজেপি সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় 272 আসনের জাদুকরী সংখ্যায় পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছে। দলটি 240টি আসন পেয়েছে। এর অর্থ হল বিজেপিকে প্রাথমিকভাবে দুটি প্রধান মিত্র, নীতীশ কুমারের জেডি(ইউ) এবং অন্ধ্রপ্রদেশের চন্দ্রবাবু নাইডুর তেলেগু দেশম পার্টির (টিডিপি) সমর্থনের উপর নির্ভর করতে হবে। এই দুই দলের মিলিত আসন ২৮টি।

কংগ্রেস স্বভাবতই এই ফলাফল নিয়ে উৎফুল্ল। গতকাল বিকেলে দলীয় দপ্তরে সোনিয়া গান্ধী, রাহুল ও প্রিয়াঙ্কাকে পাশে নিয়ে সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, এই ফলাফল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির রাজনৈতিক ও নৈতিক পরাজয়। গোটা নির্বাচনটাই বিজেপি লড়েছিল মোদির নামে এবং যাবতীয় গ্যারান্টিও দিয়েছিলেন মোদি। এটা ছিল তাঁর পক্ষে অথবা বিপক্ষের গণভোট। জনতা তাঁর বিরুদ্ধেই মত দিয়েছে। খাড়গে ও রাহুল দুজনেই জানিয়েছেন, ইন্ডিয়া জোটের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হবে বুধবার (আজ)। সবার সঙ্গে আলোচনা করে সেখানে পরবর্তী সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে। ওয়েনাড ও রায়বেরিলি, দুই জেতা আসনের কোনটি রাখবেন আর কোনটি ছাড়বেন—সে সিদ্ধান্তও সবার সঙ্গে আলোচনার পর নেবেন বলে রাহুল জানান। দুই নেতাই বলেন, এই জয় জনতার জয়। এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই, আগামী দিনগুলোতে প্রশাসক হিসেবে নরেন্দ্র মোদিকে নতুনভাবে আবির্ভূত হতে হবে। সেই ভূমিকা কোনো দিন তিনি পালন করেননি। গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন তাঁর সরকার ছিল নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ। কারও ওপর নির্ভর করতে হয়নি। প্রধানমন্ত্রী হিসেবেও তাঁর নেতৃত্বাধীন বিজেপিকে কখনো অন্য কারও মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়নি। ২০১৪ সালে সরকার গড়েছিলেন ২৮২ আসন পেয়ে। পাঁচ বছর পর পান ৩০৩ আসন। এবার এক ঝটকায় তা ২৪০-এ নেমেছে। সরকার গড়ার এই যে ৩২টি আসন ঘাটতি, তা মেটাতে হবে জেডি–ইউ, টিডিপি, শিবসেনার শিন্ডে গোষ্ঠী, চিরাগ পাসোয়ানের এলজেপি ও উত্তর প্রদেশের জয়ন্ত চৌধুরীর আরএলডির মতো দলগুলোর সমর্থন নিয়ে। এদের কাউকেই উপেক্ষা বা অবজ্ঞা করার মতো অবস্থায় মোদির বিজেপি থাকবে না; বরং সারাক্ষণ তাদের গুরুত্ব দিতে হবে, দাবি মানতে হবে এবং পছন্দের মন্ত্রিত্বও দিতে হবে। না হলে জোট ছাড়ার প্রচ্ছন্ন শঙ্কার মধ্যে থাকতে হবে। নীতীশ কুমার ও চন্দ্রবাবুর অতীত মোদির জানা। বারবার তাঁরা জোটে এসেছেন, বেরিয়েও গেছেন। নাইডু এবার আরও শক্তিশালী ও ক্ষমতাবান। অন্ধ্র প্রদেশে একার ক্ষমতাতেই সরকার গড়ার মতো অবস্থায় তিনি। মোদি তাঁকে এতটাই গুরুত্ব দিচ্ছেন যে গণনা চলাকালীনই তাঁকে ফোন করে জানিয়ে দেন, তাঁর শপথে নিজে উপস্থিত থাকবেন। চন্দ্রবাবু শপথ নেবেন ৯ জুন, ওই দিনটিই মোদি বেছে রেখেছিলেন তৃতীয়বার শপথ নেওয়ার জন্য।

জোট সরকার চালানোর কোনো অভিজ্ঞতাই মোদির নেই। জোটের নীতি কেমন, তা–ও তাঁর অজানা। টানা ১০ বছর দাপিয়ে তিনি শাসন করেছেন, কারও তোয়াক্কা না করে পুরোপুরি নিজের ইচ্ছেমতো সরকার চালিয়েছেন। এখন তাঁকে সেই অনমনীয় চরিত্র নমনীয় করে শরিকদের যাবতীয় আবদার মেনে শাসন করার কৌশল শিখতে হবে। আত্মমগ্ন ও কর্তৃত্ববাদী কোনো শাসকের পক্ষে রাতারাতি এই রূপান্তর কঠিন, কিন্তু মোদিকে সেটাই রপ্ত করতে হবে। এমন মোদিকে কেউ কখনো দেখেনি, তাই এ ক্ষেত্রে তিনি নিজেই চমকপ্রদ দ্রষ্টব্য হয়ে উঠবেন।

এই ভোট ও তার ফলাফল নরেন্দ্র মোদির কয়েকটি স্বপ্নও ভেঙে দেবে। যেমন তাঁর সাধের ‘এক দেশ এক ভোট’ নীতি। তিনি ভেবেছিলেন, প্রথম দুবারের মতো একক ক্ষমতায় তৃতীয়বার সরকারে এলে এই নীতি চালু করবেন। ইন্ডিয়া জোট শুরু থেকেই ওই নীতির বিরোধী। এনডিএর শরিকদেরও তাতে মত থাকবে কি না, সন্দেহ। একইভাবে, বহু প্রচারিত অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু করার বিষয়টিও বানচাল হয়ে যাবে। দুটি সিদ্ধান্ত বলবৎ করতে গেলে সংবিধান সংশোধন জরুরি, যার জন্য প্রয়োজন সংসদের দুই–তৃতীয়াংশ সমর্থন; এই ফলের পর যা আশা করা বৃথা। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে বাতিল হওয়া ‘ইলেকটোরাল বন্ড’ কিছুটা পাল্টে নতুন করে আনার পরিকল্পনা মোদির ছিল। সেই আশাও জলাঞ্জলি দিতে হবে। ‘পিএম কেয়ার্স’ তহবিলও এরপর সরকারি অডিটের আওতার বাইরে রাখা মোদির পক্ষে সম্ভব হবে কি না, বলা কঠিন। বিরোধীদের উপস্থিতি সোয়া দুই শর বেশি হওয়ায় অর্ধেক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যানের পদ তাদের দিতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, গত পাঁচ বছর হীনবল বিরোধীদের যে দাবি মোদি কর্ণপাত করেননি, তা এবার মেনে নিয়ে লোকসভার ডেপুটি স্পিকারের পদটি দিতে হবে বিরোধীদের। ৯৯ আসন পাওয়া কংগ্রেসকে দিতে হবে বিরোধী নেতার পদ, যা পেতে গেলে ৫৫ আসন জিততে হয়। গতবার যা ছিল মোদির দাক্ষিণ্য।

দেখার মতো আরও কিছু বিষয় রয়েছে। গত পাঁচ বছর ধরে মোদি সরকার ইডি, সিবিআই, আয়কর বিভাগ, এবং এনআইএর যথেচ্ছ ব্যবহার করেছে বলে বিরোধীদের অভিযোগ। তারা দল ভাঙানো ও দল গঠনের মতো কাজে এসব সংস্থাকে ব্যবহার করেছে। রাহুল নিজেই গতকাল বলেছেন, কংগ্রেসকে বিপদে ফেলতে তাদের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছিল। তৃতীয়বার ক্ষমতায় আসার পর শক্তিশালী বিরোধীদের চাপে এই প্রবণতা কতটা বজায় থাকে, সেটাও দেখার বিষয়। স্পষ্টতই এত দিন মোদির সরকার যেভাবে এসব সংস্থা ব্যবহার করে এসেছে, তাতে তাদের রাশ টানতেই হবে। এত দিন ধরে যে বিশেষণে মোদি ভূষিত হয়েছেন, সেই ‘স্বৈরতন্ত্রী’ তকমা বজায় রাখতে তিনি পারবেন কি না, সেটাও প্রশ্ন

এই ফলাফল জাতীয় রাজনীতিতে কংগ্রেসের প্রাসঙ্গিকতা নতুন করে ফিরিয়ে আনল। হিন্দি বলয়ে যে দল প্রায় মুছে গিয়েছিল, কিছুটা হারানো জায়গা তারা ফিরিয়ে আনল, বিশেষ করে উত্তর প্রদেশ, হরিয়ানা, রাজস্থান ও বিহারে। পাঞ্জাবে প্রতিষ্ঠিত সব কংগ্রেস নেতা বিজেপিতে চলে গেলেও একার ক্ষমতায় তারা অধিকাংশ আসন জিতেছে। মহারাষ্ট্র, তেলেঙ্গানা ও কর্ণাটকে জমি খুঁজে নিয়েছে। তবে ব্যর্থতা তাদের অবশ্যই আছে। মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, ওডিশা, এবং অন্ধ্র প্রদেশে তারা প্রায় কিছুই করতে পারেনি। কিন্তু আসনসংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ করে ১০০ ছুঁই ছুঁই অবস্থায় পৌঁছে যাওয়া দলটাকে চনমনে করে তুলবে। বিশেষ করে উত্তর প্রদেশে পায়ের তলার জমি আরও শক্ত করতে প্রিয়াঙ্কাকে রায়বেরিলি থেকে জিতিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

গতকাল সন্ধ্যায় মহা ধুমধামের সঙ্গে বিজেপি তাদের দলীয় দপ্তরে বিজয় দিবস উদ্‌যাপন করল। দৃশ্যত উৎফুল্ল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি হাসিমুখে অভিবাদন গ্রহণ করলেন। যদিও মনে খচখচানি তাঁর থাকারই কথা। দলের ৩৭০ আসন পাওয়ার তো দূরের কথা, জোটকে ৩০০ আসন পাইয়ে দিতেও তিনি ব্যর্থ। শুধু কি তাই? যে বারানসি থেকে গতবার তিনি সাড়ে ৪ লাখের বেশি ব্যবধানে জিতেছিলেন, সেখানে পিছিয়ে পড়েও এবার জয় পেয়েছেন মাত্র দেড় লাখ ভোটে। নরেন্দ্র মোদির কাছে দুটোর কোনোটাই সম্মানের নয়।

বিস্তারিত আরো জানতে কিক্ল করুন 

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

আপলোডকারীর তথ্য

জোট সরকার চালানোর অভিজ্ঞতার অভাব মোদির

আবারো জোটের ওপর ভর করতে হচ্ছে মোদিকে

আপডেট সময় : ০৪:৪০:৩৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৫ জুন ২০২৪

2014 সালে, মোদির সরকার 282টি আসন পায়। পাঁচ বছর পরে, তারা 303 আসন লাভ করে। জোট সরকার চালানোর অভিজ্ঞতার অভাব মোদির। এখন, প্রথমবারের মতো, তিনি একটি গঠন করতে বাধ্য হয়েছেন। তিনি টানা তৃতীয় মেয়াদে আবারও প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথে। তিনি জওহরলাল নেহরুর পদাঙ্ক অনুসরণ করেন, যিনি এই ধরনের কৃতিত্বের কথা চিন্তা করেছিলেন। যদিও নেহেরু একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে ব্যর্থ হন, মোদির লক্ষ্য “চার শূন্য” অর্থবহ করে রাজীব গান্ধীর রেকর্ড ছাড়িয়ে যাওয়া।

গতকাল, লোকসভা নির্বাচনে এককভাবে বিজেপি সর্বোচ্চ সংখ্যক আসন লাভ করলেও, এনডিএ-র কাছে তিনশো আসনের ঘাটতি রয়েছে। কংগ্রেস “ভারত” জোটের সূচনা করেছিল, মোদির বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকারের অবসান ঘটাতে এক দশক পর দৃঢ়ভাবে উঠেছিল। সরকার গঠনের সময়, মোদি এখন প্রাথমিকভাবে বিরোধিতা করছেন। তার প্রতিটি পদক্ষেপ বিরোধী জোট ভারত থেকে প্রতিরোধের মুখোমুখি হবে।

ভারতের নির্বাচন কমিশন এবং মিডিয়া রিপোর্ট অনুসারে, বিজেপির এনডিএ 286টি আসন পেয়েছে। ভারতীয় জোট 202টি আসন পেয়েছে। বিজেপি সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় 272 আসনের জাদুকরী সংখ্যায় পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছে। দলটি 240টি আসন পেয়েছে। এর অর্থ হল বিজেপিকে প্রাথমিকভাবে দুটি প্রধান মিত্র, নীতীশ কুমারের জেডি(ইউ) এবং অন্ধ্রপ্রদেশের চন্দ্রবাবু নাইডুর তেলেগু দেশম পার্টির (টিডিপি) সমর্থনের উপর নির্ভর করতে হবে। এই দুই দলের মিলিত আসন ২৮টি।

কংগ্রেস স্বভাবতই এই ফলাফল নিয়ে উৎফুল্ল। গতকাল বিকেলে দলীয় দপ্তরে সোনিয়া গান্ধী, রাহুল ও প্রিয়াঙ্কাকে পাশে নিয়ে সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, এই ফলাফল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির রাজনৈতিক ও নৈতিক পরাজয়। গোটা নির্বাচনটাই বিজেপি লড়েছিল মোদির নামে এবং যাবতীয় গ্যারান্টিও দিয়েছিলেন মোদি। এটা ছিল তাঁর পক্ষে অথবা বিপক্ষের গণভোট। জনতা তাঁর বিরুদ্ধেই মত দিয়েছে। খাড়গে ও রাহুল দুজনেই জানিয়েছেন, ইন্ডিয়া জোটের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হবে বুধবার (আজ)। সবার সঙ্গে আলোচনা করে সেখানে পরবর্তী সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে। ওয়েনাড ও রায়বেরিলি, দুই জেতা আসনের কোনটি রাখবেন আর কোনটি ছাড়বেন—সে সিদ্ধান্তও সবার সঙ্গে আলোচনার পর নেবেন বলে রাহুল জানান। দুই নেতাই বলেন, এই জয় জনতার জয়। এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই, আগামী দিনগুলোতে প্রশাসক হিসেবে নরেন্দ্র মোদিকে নতুনভাবে আবির্ভূত হতে হবে। সেই ভূমিকা কোনো দিন তিনি পালন করেননি। গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন তাঁর সরকার ছিল নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ। কারও ওপর নির্ভর করতে হয়নি। প্রধানমন্ত্রী হিসেবেও তাঁর নেতৃত্বাধীন বিজেপিকে কখনো অন্য কারও মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়নি। ২০১৪ সালে সরকার গড়েছিলেন ২৮২ আসন পেয়ে। পাঁচ বছর পর পান ৩০৩ আসন। এবার এক ঝটকায় তা ২৪০-এ নেমেছে। সরকার গড়ার এই যে ৩২টি আসন ঘাটতি, তা মেটাতে হবে জেডি–ইউ, টিডিপি, শিবসেনার শিন্ডে গোষ্ঠী, চিরাগ পাসোয়ানের এলজেপি ও উত্তর প্রদেশের জয়ন্ত চৌধুরীর আরএলডির মতো দলগুলোর সমর্থন নিয়ে। এদের কাউকেই উপেক্ষা বা অবজ্ঞা করার মতো অবস্থায় মোদির বিজেপি থাকবে না; বরং সারাক্ষণ তাদের গুরুত্ব দিতে হবে, দাবি মানতে হবে এবং পছন্দের মন্ত্রিত্বও দিতে হবে। না হলে জোট ছাড়ার প্রচ্ছন্ন শঙ্কার মধ্যে থাকতে হবে। নীতীশ কুমার ও চন্দ্রবাবুর অতীত মোদির জানা। বারবার তাঁরা জোটে এসেছেন, বেরিয়েও গেছেন। নাইডু এবার আরও শক্তিশালী ও ক্ষমতাবান। অন্ধ্র প্রদেশে একার ক্ষমতাতেই সরকার গড়ার মতো অবস্থায় তিনি। মোদি তাঁকে এতটাই গুরুত্ব দিচ্ছেন যে গণনা চলাকালীনই তাঁকে ফোন করে জানিয়ে দেন, তাঁর শপথে নিজে উপস্থিত থাকবেন। চন্দ্রবাবু শপথ নেবেন ৯ জুন, ওই দিনটিই মোদি বেছে রেখেছিলেন তৃতীয়বার শপথ নেওয়ার জন্য।

জোট সরকার চালানোর কোনো অভিজ্ঞতাই মোদির নেই। জোটের নীতি কেমন, তা–ও তাঁর অজানা। টানা ১০ বছর দাপিয়ে তিনি শাসন করেছেন, কারও তোয়াক্কা না করে পুরোপুরি নিজের ইচ্ছেমতো সরকার চালিয়েছেন। এখন তাঁকে সেই অনমনীয় চরিত্র নমনীয় করে শরিকদের যাবতীয় আবদার মেনে শাসন করার কৌশল শিখতে হবে। আত্মমগ্ন ও কর্তৃত্ববাদী কোনো শাসকের পক্ষে রাতারাতি এই রূপান্তর কঠিন, কিন্তু মোদিকে সেটাই রপ্ত করতে হবে। এমন মোদিকে কেউ কখনো দেখেনি, তাই এ ক্ষেত্রে তিনি নিজেই চমকপ্রদ দ্রষ্টব্য হয়ে উঠবেন।

এই ভোট ও তার ফলাফল নরেন্দ্র মোদির কয়েকটি স্বপ্নও ভেঙে দেবে। যেমন তাঁর সাধের ‘এক দেশ এক ভোট’ নীতি। তিনি ভেবেছিলেন, প্রথম দুবারের মতো একক ক্ষমতায় তৃতীয়বার সরকারে এলে এই নীতি চালু করবেন। ইন্ডিয়া জোট শুরু থেকেই ওই নীতির বিরোধী। এনডিএর শরিকদেরও তাতে মত থাকবে কি না, সন্দেহ। একইভাবে, বহু প্রচারিত অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু করার বিষয়টিও বানচাল হয়ে যাবে। দুটি সিদ্ধান্ত বলবৎ করতে গেলে সংবিধান সংশোধন জরুরি, যার জন্য প্রয়োজন সংসদের দুই–তৃতীয়াংশ সমর্থন; এই ফলের পর যা আশা করা বৃথা। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে বাতিল হওয়া ‘ইলেকটোরাল বন্ড’ কিছুটা পাল্টে নতুন করে আনার পরিকল্পনা মোদির ছিল। সেই আশাও জলাঞ্জলি দিতে হবে। ‘পিএম কেয়ার্স’ তহবিলও এরপর সরকারি অডিটের আওতার বাইরে রাখা মোদির পক্ষে সম্ভব হবে কি না, বলা কঠিন। বিরোধীদের উপস্থিতি সোয়া দুই শর বেশি হওয়ায় অর্ধেক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যানের পদ তাদের দিতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, গত পাঁচ বছর হীনবল বিরোধীদের যে দাবি মোদি কর্ণপাত করেননি, তা এবার মেনে নিয়ে লোকসভার ডেপুটি স্পিকারের পদটি দিতে হবে বিরোধীদের। ৯৯ আসন পাওয়া কংগ্রেসকে দিতে হবে বিরোধী নেতার পদ, যা পেতে গেলে ৫৫ আসন জিততে হয়। গতবার যা ছিল মোদির দাক্ষিণ্য।

দেখার মতো আরও কিছু বিষয় রয়েছে। গত পাঁচ বছর ধরে মোদি সরকার ইডি, সিবিআই, আয়কর বিভাগ, এবং এনআইএর যথেচ্ছ ব্যবহার করেছে বলে বিরোধীদের অভিযোগ। তারা দল ভাঙানো ও দল গঠনের মতো কাজে এসব সংস্থাকে ব্যবহার করেছে। রাহুল নিজেই গতকাল বলেছেন, কংগ্রেসকে বিপদে ফেলতে তাদের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছিল। তৃতীয়বার ক্ষমতায় আসার পর শক্তিশালী বিরোধীদের চাপে এই প্রবণতা কতটা বজায় থাকে, সেটাও দেখার বিষয়। স্পষ্টতই এত দিন মোদির সরকার যেভাবে এসব সংস্থা ব্যবহার করে এসেছে, তাতে তাদের রাশ টানতেই হবে। এত দিন ধরে যে বিশেষণে মোদি ভূষিত হয়েছেন, সেই ‘স্বৈরতন্ত্রী’ তকমা বজায় রাখতে তিনি পারবেন কি না, সেটাও প্রশ্ন

এই ফলাফল জাতীয় রাজনীতিতে কংগ্রেসের প্রাসঙ্গিকতা নতুন করে ফিরিয়ে আনল। হিন্দি বলয়ে যে দল প্রায় মুছে গিয়েছিল, কিছুটা হারানো জায়গা তারা ফিরিয়ে আনল, বিশেষ করে উত্তর প্রদেশ, হরিয়ানা, রাজস্থান ও বিহারে। পাঞ্জাবে প্রতিষ্ঠিত সব কংগ্রেস নেতা বিজেপিতে চলে গেলেও একার ক্ষমতায় তারা অধিকাংশ আসন জিতেছে। মহারাষ্ট্র, তেলেঙ্গানা ও কর্ণাটকে জমি খুঁজে নিয়েছে। তবে ব্যর্থতা তাদের অবশ্যই আছে। মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, ওডিশা, এবং অন্ধ্র প্রদেশে তারা প্রায় কিছুই করতে পারেনি। কিন্তু আসনসংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ করে ১০০ ছুঁই ছুঁই অবস্থায় পৌঁছে যাওয়া দলটাকে চনমনে করে তুলবে। বিশেষ করে উত্তর প্রদেশে পায়ের তলার জমি আরও শক্ত করতে প্রিয়াঙ্কাকে রায়বেরিলি থেকে জিতিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

গতকাল সন্ধ্যায় মহা ধুমধামের সঙ্গে বিজেপি তাদের দলীয় দপ্তরে বিজয় দিবস উদ্‌যাপন করল। দৃশ্যত উৎফুল্ল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি হাসিমুখে অভিবাদন গ্রহণ করলেন। যদিও মনে খচখচানি তাঁর থাকারই কথা। দলের ৩৭০ আসন পাওয়ার তো দূরের কথা, জোটকে ৩০০ আসন পাইয়ে দিতেও তিনি ব্যর্থ। শুধু কি তাই? যে বারানসি থেকে গতবার তিনি সাড়ে ৪ লাখের বেশি ব্যবধানে জিতেছিলেন, সেখানে পিছিয়ে পড়েও এবার জয় পেয়েছেন মাত্র দেড় লাখ ভোটে। নরেন্দ্র মোদির কাছে দুটোর কোনোটাই সম্মানের নয়।

বিস্তারিত আরো জানতে কিক্ল করুন